সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

bangladesh-primary-education.jpg

শ্রেণীকক্ষে শিক্ষার্থী ছাত্র নির্যাতনের বর্তমান প্রেক্ষিত ও আমাদের করণীয়

শুধু শিক্ষকের নির্যাতনই আমাদের দেশের ছাত্রদের জন্য বড় সমস্যা নয়, অভিবাভকেরাও কম নন। তবে অভিবাভকদের শারীরিক নির্যাতনের চেয়ে মানসিক নির্যাতনের শিকার বেশিরভাগ ছাত্র।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নির্যাতন তৃতীয় বিশ্বে নতুন কোনও সমস্যা নয়। বিশেষত বাংলাদেশে এটা যেন অতি স্বাভাবিক কিছু হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইন আছে কিন্তু এখনও নির্যাতন চলছে অনেক স্কুল-কলেজেই। পত্রিকায় পাতায় শিক্ষকের হাতে বর্বর নির্যাতনের শিকার ছাত্রের ঘটনা পত্রিকার পাতায় যেনও খুব স্বাভাবিক সংবাদ হয়ে উঠেছে। 

নিয়মিত ক্লাস না করায়, প্রাইভেট না পড়ায় ছাত্রদেরকে শারীরিক নির্যাতন কিংবা লাঞ্ছিত করবার মত ঘটনা পুরো দেশেই কমবেশি হচ্ছে । সরকারি কলেজগুলোতে মারের যন্ত্রণা না থাকলেও শিক্ষকদের কাছে প্রাইভেট পড়ার জন্য চাপ যথেষ্ট রয়েছে। শিক্ষকেরা নিজের প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী প্রাইভেট পড়াতে পারবেন না, এমন বিধি থাকলেও এর তোয়াক্কা করেন না অনেকেই। আমি বলছি না সব শিক্ষকই এমন। তবে এদের সংখ্যা কিন্তু নেহাত কম নয়। 

আর হাই স্কুল, প্রাইমারি স্কুলে এই হার আরও অনেক বেশি। শুধু শিক্ষকের নির্যাতনই আমাদের দেশের ছাত্রদের জন্য বড় সমস্যা নয়, অভিবাভকেরাও কম নন। তবে অভিবাভকদের শারীরিক নির্যাতনের চেয়ে মানসিক নির্যাতনের শিকার বেশিরভাগ ছাত্র। আমাদের অভিবাকেরা সন্তানের পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে এতই উদ্বিগ্ন থাকেন যে তারা মনে করেন তার সন্তান ২৪ ঘণ্টাই পড়বে। এতে তার সন্তানের মানসিক বিকাশ কতোটা বাধাগ্রস্থ হচ্ছে তা তারা ভেবে দেখেন না।

আর পরীক্ষা চলাকালে তাদের এই উদ্বিগ্নতার মাত্রা সীমা ছাড়িয়ে যায়। যেমন পরীক্ষা শুরু হওয়ার অনেক আগে থেকেই বাইরে ঘোরাঘুরি, পাঠ্যবইয়ের বাইরে বই পড়া, খেলাধুলা সকল কিছুর প্রতি নিষেধাজ্ঞা আরোপ হয়। শুধু বইয়ের মাঝে মুখ গুজে বসে থাকো! বস্তুত পরীক্ষা সম্পর্কে ভয়ভীতি পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের ক্ষেত্রে কি আসলেই সহায়ক?

গবেষণায় দেখা গিয়েছে অতিরিক্ত ভয় আলসার, মাথাব্যথা, এলার্জির, ডিপ্রেশনের মতো কিছু অসুখের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রতি বছর এসএসসি ও  এইচএসসি এই  দুই বড় পাবলিক পরীক্ষায় কৃতকার্য না হতে পেরে অনেক ছাত্রদের আত্মহত্যা করার কথাও শুনা যায়। পড়াশুনা নিয়ে ঠিক কতটুকু চাপ শিশুকে প্ররোচিত করে এইরকমভাবে নিজেকে ধ্বংস করে দেয়ার পথ বেঁছে নিতে!

যা হোক, দেরীতে হলেও সরকার এ সকল ব্যাপারে অনেকটাই সচেতন হয়েছে।  

শ্রেণীকক্ষে শিক্ষার্থীদের ওপর শাস্তি নিষিদ্ধসংক্রান্ত একটি নীতিমালা প্রণয়ন করেছে সরকার। নীতিমালায় শারীরিক ও মানসিক শাস্তির সংজ্ঞা নির্ধারণসহ এ বিষয়ে করণীয় ঠিক করে দেওয়া হয়েছে।

এতে বলা হয়, ছাত্রছাত্রীদের ১১ ধরনের শারীরিক শাস্তি দেওয়া যাবে না। আর মানসিক শাস্তি হিসেবে মা-বাবা, বংশ ও ধর্ম সম্পর্কে অশালীন মন্তব্য করা যাবে না। অশোভন অঙ্গভঙ্গিসহ শিক্ষার্থীদের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে, এমন আচরণও করা যাবে না।

উচ্চ আদালত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের শারীরিক শাস্তি নিষিদ্ধের সাড়ে আট মাস পর ২১ এপ্রিল শিক্ষা মন্ত্রণালয় ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি রহিত করা-সংক্রান্ত নীতিমালা ২০১১’ প্রণয়ন করে।

নীতিমালায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বলতে সরকারি ও বেসরকারি প্রাথমিক, নিম্নমাধ্যমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজ, উচ্চমাধ্যমিক কলেজ, কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মাদ্রাসাসহ (আলিম পর্যন্ত) অন্য সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে বোঝানো হয়েছে। নীতিমালায় নিষিদ্ধ করা শাস্তিগুলো হলো, হাত-পা বা কোনো কিছু দিয়ে আঘাত বা বেত্রাঘাত, শিক্ষার্থীর দিকে চক বা ডাস্টারজাতীয় বস্তু ছুড়ে মারা, আছাড় দেওয়া ও চিমটি কাটা, কামড় দেওয়া, চুল টানা বা চুল কেটে দেওয়া, হাতের আঙুলের ফাঁকে পেনসিল চাপা দিয়ে মোচড় দেওয়া, ঘাড় ধাক্কা, কান টানা বা ওঠবস করানো, চেয়ার, টেবিল বা কোনো কিছুর নিচে মাথা দিয়ে দাঁড় করানো বা হাটু গেড়ে দাঁড় করে রাখা, রোদে দাঁড় করে বা শুইয়ে রাখা কিংবা সূর্যের দিকে মুখ করে দাঁড় করানো এবং ছাত্রছাত্রীদের দিয়ে এমন কোনো কাজ করানো, যা শ্রম আইনে নিষিদ্ধ।

নীতিমালায় বলা হয়, কোনো শিক্ষক-শিক্ষিকা কিংবা শিক্ষা পেশায় নিয়োজিত কোনো ব্যক্তি অথবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী পাঠদানকালে কিংবা অন্য কোনো সময় ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে উল্লিখিত আচরণ করবেন না, যা শাস্তি হিসেবে গণ্য হয়।

এসব অপরাধের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে, তা ১৯৭৯ সালের সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালার পরিপন্থী হবে এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

উপরোক্ত অভিযোগের জন্য অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ১৯৮৫-এর আওতায় অসদাচরণের অভিযোগে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে। প্রয়োজনে ফৌজদারি আইনেও ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে। কিন্তু যে হারে নির্যাতন হচ্ছে সে হারে কত জনের বিরুদ্ধে ব্যাবস্থা নেওয়া হয়েছে তা কিন্তু প্রশ্নবিদ্ধ। এ বিধি প্রণয়নের পর চালানো এক জরিপে জানা যায় এখনও  ৫৯ শতাংশ শিক্ষার্থী শিক্ষকের হাতে শারীরিক শাস্তি পেয়ে থাকে।

প্রত্যাশিত হারে না হলেও আশার কথা হচ্ছে তুলনামূলক ভাবে আগের চেয়ে মানসিক ও দৈহিক নির্যাতন কমেছে। কিন্তু অপরিবর্তিত রয়েছে কউমি মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যাবস্থায় । নানা কারণে সরকার কউমি মাদ্রাসার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে না। আমি তা করতেও বলছি না, কিন্তু তা না করলেও ছাত্র নির্যাতনের মত এমন গর্হিত অপরাধ এড়িয়ে যাওয়া যায় না। দেশের অনেক কউমি মাদ্রাসায় শারীরিক নির্যাতন যেনও নিয়মিত অনুষঙ্গ। একবার পত্রিকায় দেখেছিলাম ঢাকার এক মহিলা মাদ্রাসার শিক্ষিকা তার ছাত্রীদের পায়ে গরম ভাজা কাঠির ছেঁক দিয়েছে। এটা কেমন মধ্যযুগীয় বর্বরতা? সরকারকে দেশের প্রতিটি নাগরিকের সুস্থ মানসিক ও শারীরিক বিকাশ নিশ্চিত করতে হবে। মনে রাখতে কউমি মাদ্রাসায় পড়া ছেলেটিও বিশ্বাস করে এ দেশ তার। আর তাই তার পূর্ণ বিকাশের দায়িত্ব আমাদের, আমাদের এ রাষ্ট্রের।

স্কুল, মাদ্রাসা বা কলেজ যেখানেই হোক, এ নোংরা সামাজিক ব্যাধি বন্ধ করতে প্রয়োজন আইনের যথাযথ প্রয়োগ, প্রয়োজন গণসচেতনতা। গণসচেতনাতা বৃদ্ধির লক্ষে এ বিষয়টিকে সামনে রেখে রচনা প্রতিযোগিতা, বিতর্ক প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা যেতে পারে। তবে এ ব্যাপারে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে স্থানীয় প্রশাসন এবং তাদেরকে তা করতে হবে। ছাত্র নির্যাতন বন্ধ করতে অবশ্যই আইনের কঠোর ও যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। ছাত্র নির্যাতন রোধে মনিটরিং ব্যাবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। আমাদের এক হয়ে রুখতে হবে,  প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে,  প্রতিহত করতে হবে। প্রতিহত করতে হবে আমাদের দেশের জন্য। আমদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য। যারা ভবিষ্যৎ বাংলাদেশে চারণ করবে। বাংলাদেশের নেতৃত্ব দিবে। 

-
ছাত্র, দ্বাদশ শ্রেণি , ময়মনসিংহ কলেজ।
শিশু সাংবাদিক ও প্রেসিডেন্ট, ইচ্ছেপুরণ ফাউন্ডেশন। 


এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।

education, primary, student, torture, assault, love, care, teaching, teacher