সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

সমালোচনা শিক্ষকতা একটি মহৎ পেশা, এ পেশার মর্যাদা রক্ষা করুন

কিন্তু অতীব দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমাদের বর্তমান সমাজে পিতৃতুল্য কিংবা জীবন চলার পথে আদর্শ ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হতে পারেন এমন শিক্ষকের সংখ্যা খুবই নগন্য।

শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড-কথাটি সর্বজনবিদিত এবং চিরন্তন সত্য।  শিক্ষা ব্যতীত কোন জাতি তার ভাগ্যের উন্নয়ন করতে পারে না । 
যে জাতি যত বেশি শিক্ষিত সে জাতি তত বেশি উন্নত।  পৃথিবীর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যেসব জাতি জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে  অগ্রগামী ছিল তারাই যুগ যুগ ধরে পৃথিবীতে নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব করেছে। 

দৃষ্টান্তস্বরূপ প্রাচীন গ্রীস,পারস্য, মিশর প্রভৃতি জাতির কথা বলতে পারি। বর্তমান বিশ্বেও এ ধারা অব্যাহত রয়েছে। বর্তমান বিশ্বে যারা নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের  আসনে অধিষ্ঠিত যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, রাশিয়া, ফ্রান্স, জাপান, জার্মানী প্রভৃতি রাষ্ট্রসমূহ শুধু অর্থ সম্পদ ও সামরিক শক্তিতেই বলীয়ান তা নয়।  

জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে তারা অনেক দূর এগিয়ে। আর এসব কিছুর মূলে রয়েছে প্রকৃত শিক্ষার প্রসার তথা সুশিক্ষার প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ। একটি দেশ তখনই ভালো হবে যখন সে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তথা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ভালো হবে।আমার মতে কেবল সনদ সর্বস্ব শিক্ষা কিংবা একটি ভালো চাকুরী লাভের উদ্দেশ্যে বিদ্যার্জন কখনোই উন্নত জাতি গঠনে সহায়ক হতে পারে না ।

একটি সুশিক্ষিত ও উন্নত জাতি গঠন করতে হলে আমাদের ব্যক্তিত্ব ও মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটাতে হবে। উন্নত বিশ্বের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে আমাদের চিন্তা শক্তিকে সঠিকভাবে  কাজে লাগাতে হবে। নতুন নতুন জ্ঞান বিজ্ঞানের দ্বার উন্মোচন করতে হবে। 

আর এক্ষেত্রে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে। একটি দেশের বিশ্ববিদ্যালয় তথা  শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো তখনই ভালো হবে যখন ঐ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকবৃন্দ ভালো হবেন এবং তারা তাদের শিক্ষার্থীদের সত্য জ্ঞান ও সুশিক্ষা দান করবেন।

নিঃসন্দেহে  শিক্ষকতা একটি মহৎ পেশা। পেশা হিসেবে শিক্ষকতাকে অন্য সকল পেশার জননী বলা হয়। সেটি শিক্ষার যেকোন স্তরেই হোক না কেন। হতে পারে সেটি কোন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা কিংবা কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে। দল-মত শ্রেনী-পেশা  নির্বিশেষে একজন শিক্ষক সমাজের সকল মানুষের কাছে অত্যন্ত মর্যাদা ও সম্মানের পাত্র। 

কেননা মানুষ গড়ার কারিগর একজন শিক্ষকই পারেন একটি সুশিক্ষিত ও উন্নত জাতি গঠন করতে। শিক্ষকের ব্যক্তিত্ব,আদর্শ ও মানবিক মূল্যবোধ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে একজন শিক্ষার্থীর উপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। পিতা মাতা সন্তান জন্ম দিলেও শিক্ষকই তাকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলেন।  

একজন শিক্ষকই পারেন শিশুর সুপ্ত প্রতিভাবে জাগ্রত করে জাতির উন্নয়নে নিযুক্ত করতে। তার চিন্তা চেতনা ও মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটাতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন একজন শিক্ষক। সন্তানের কাছে তার পিতা মাতা যেমন আদর্শ ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত তেমনি একজন শিক্ষকও তার ব্যক্তিত্ব,আদর্শ ও কর্মের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর কাছে আদর্শ ও অনুকরণীয় হয়ে থাকেন।   

কিন্তু অতীব দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমাদের বর্তমান সমাজে পিতৃতুল্য কিংবা জীবন চলার পথে আদর্শ ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হতে পারেন এমন শিক্ষকের সংখ্যা খুবই নগন্য। আমাদের সমাজে এমন অনেক শিক্ষক আছেন যারা প্রকৃতপক্ষে শিক্ষকতাকে মন থেকে ভালবেসে এ পেশায় আসেননি। 

হয়তোবা তাদের জীবনের লক্ষ্য বা স্বপ্ন ছিল অন্যকিছু। কিন্তু দলীয় বিবেচনায় কিংবা অন্য কোনভাবে সুযোগ পেয়েছেন বলে সামাজিক  মান মর্যাদার কথা বিবেচনা করে সে সু্যোগ আর হাতছাড়া করতে চাননি। আবার হতে পারে বাস্তব প্রেক্ষাপটে জীবিকার তাগিদে  কিংবা লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়ে অনীহা সত্ত্বেও শিক্ষকতার মত মহৎ পেশায় নিজেকে নিয়োজিত করেছেন।  

ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে কিন্তু সেটিকে আমি দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থাপন করছিনা। এ সমাজে এমন শিক্ষকও আছেন যাদের অনেক বড় বড় পদে চাকুরী লাভের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও শুধু মন থেকে ভালোবাসার কারনে সুনাগরিক ও উন্নত জাতি গড়ার কাজে নিজেদের নিয়োজিত করেছেন। যারা কেবল সুনাগরিক ও উন্নত জাতি গঠনের উদ্দেশ্যে শিক্ষকতাকে মন থেকে ভালোবেসে এ পেশায় যোগদান করেন তারা তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য অত্যন্ত আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সাথে পালন করেন, এ ব্যাপারে কারো দ্বিমত নেই। 

কিন্তু যারা শিক্ষকতা পেশার আড়ালে কেবল বিভিন্ন রকম সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা ভোগ করার উদ্দেশ্যে এ পেশায় যোগদান করেন তারা যতটা না শিক্ষাদান করেন তার চেয়ে বেশি শিক্ষকতার মত মহৎ পেশাটিকে কলঙ্কিত করেন। নতুন নতুন জ্ঞান বিজ্ঞান নিয়ে প্রচুর অধ্যয়ন ও গবেষণা  করার পরিবর্তে তারা চাটুকারিতা, রাজনীতির নামে নগ্ন দলবাজি ও নিজেদের ভোগবিলাস নিয়ে মত্ত থাকেন। তাদের শিক্ষকতার কর্মকান্ড অনেকাংশে কেবল শ্রেনীকক্ষেই সীমাবদ্ধ। শ্রেনীকক্ষের বাইরে তাদের আসল পরিচয় শিক্ষক নয়।

বরং নিজেদের শিক্ষক পরিচিতিকে ব্যবহার করে শিক্ষকতার আড়ালে তারা নানান পদ পদবী ও বিভিন্ন রকম সুযোগ সুবিধা ভোগ করে থাকেন। এক্ষেত্রে একজন শিক্ষক হিসেবে  নিজেদের ব্যক্তিত্ব ও আদর্শ বিসর্জন দিতেও তারা কুণ্ঠাবোধ করেন না। আর এসব পদ-পদবী লাভ ও নিজেদের ভোগবিলাসের পেছনে প্রচুর সময় ব্যয় করতে গিয়ে তারা নতুন নতুন জ্ঞান বিজ্ঞান নিয়ে  গবেষণা ও শিক্ষার্থীদের সুশিক্ষাদানে সময় দিতে ব্যর্থ হন।  

ফলে  শিক্ষার্থীদের সুপ্ত প্রতিভা, ব্যক্তিত্ব ও মনুষ্যত্বের বিকাশ ও চিন্তা চেতনা প্রসারিত করার সুযোগ হয়ে  উঠে না। কেবল একটি সনদ লাভের উদ্দেশ্যে গতানুগতিক নোট বই, পূর্বেকার কারো তৈরিকৃত শীট কিংবা গাইড বই পড়েই শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করতে বাধ্য হয়। আর এভাবে চলতে থাকলে শুধু শিক্ষাব্যবস্থা নয় আমাদের সামগ্রিক জাতীয় উন্নয়ন মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়ে পড়বে।

সুনাগরিক ও উন্নত জাতি গড়ার কারিগর দেশের শিক্ষক সমাজের প্রতি আমার বিনীত আহ্বান, বিভিন্ন প্রকার অনৈতিক ও অবৈধ সুযোগ সুবিধা ভোগের  উদ্দেশ্যে চাটুকারিতা ও নগ্ন দলবাজির পেছনে ছোটাছোটি পরিহার করে একজন শিক্ষক হিসেবে নিজেদের আসল দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে আরো বেশি সচেতন হন। দেশ ও জনগণের কল্যাণে আত্মনিয়োগ করুন। 

একটি সুশিক্ষিত ও উন্নত জাতি গঠনের উদ্দেশ্যে সুনাগরিক তৈরি, জ্ঞান বিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা ও প্রকৃত শিক্ষাদানে মনোনিবেশ করুন।

মোঃ ওমর ফারুক

শিক্ষক

জাগো ফাউন্ডেশন অনলাইন স্কুল
ঢাকা ।

এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।

শিক্ষক, দায়িত্ব, কর্তব্য, ছাত্র, সমাজ